বয়স কি যোগ্যতার মাপকাঠি? শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বয়সের বেড়াজাল ও বাস্তবতা
— আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া (আরিফ শামছ্)
মানুষের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক বিশ্বে ‘আজীবন শিক্ষা’ (Lifelong Learning) ধারণাটি একটি স্বীকৃত সত্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের দেশে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও চাকরির ক্ষেত্রে এখনো বয়সের কঠোর বেড়াজাল বিদ্যমান। এই প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা কি আসলেই প্রয়োজনীয়, নাকি এটি আমাদের বিশাল এক জনশক্তির অপচয় ঘটাচ্ছে?
শিক্ষাক্ষেত্রে বয়স ও বাস্তবতা
UNESCO-এর নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষাকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে দেখা হয়। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে ৫০ বা ৬০ বছর বয়সেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয়। অথচ বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বয়সের অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে।
পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা:
* জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রতি ৬ জন মানুষের মধ্যে ১ জনের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি। এই বিশাল জনশক্তিকে বয়সসীমার কারণে কর্মক্ষেত্র থেকে বাদ দেওয়া আধুনিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি।
* অনেক দেশে বয়স্কদের জন্য 'এডার্ট এডুকেশন' প্রোগ্রাম থাকলেও আমাদের দেশে তা অত্যন্ত সীমিত, যা আজীবন শিক্ষার ধারণার পরিপন্থী।
গবেষণায় বয়সের বাধা: মেধার অপচয়
গবেষণার ক্ষেত্রে বয়সসীমা আরোপ করা সম্ভবত সবচেয়ে অযৌক্তিক। বিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখা গেছে, আলবার্ট আইনস্টাইন থেকে শুরু করে জন বি. গুডএনাফ—অনেকেই জীবনের পরিণত বয়সে এসে তাঁদের যুগান্তকারী কাজ করেছেন।
গবেষণালব্ধ যুক্তি:
* হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সী কর্মীদের মধ্যে 'কগনিটিভ ফ্লেক্সিবিলিটি' বা জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষমতা ২৫-৩০ বছর বয়সীদের তুলনায় অনেক সময় বেশি থাকে।
* গবেষণার মান হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য, জন্মসাল নয়। গবেষণায় কঠোর বয়সসীমা তরুণ ও অভিজ্ঞ—উভয় প্রজন্মের গবেষকদের জন্যই নিরুৎসাহজনক।
চাকরির বাজারে বয়সের প্রাচীর:
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। কঠোর বয়সসীমার ফলে একটি বড় অংশের জনশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে:
কেন বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন?
সামাজিক বঞ্চনা: পারিবারিক দায়িত্ব বা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে যারা কর্মজীবনে প্রবেশে বিলম্ব করেন, তারা আজীবন বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়েন।
নারীদের প্রতিকূলতা: বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের হার কম হওয়ার অন্যতম কারণ হলো পারিবারিক বিরতি এবং পরবর্তীতে বয়সের কারণে সুযোগ হারানো।
দক্ষতার অপচয়: অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির বাস্তব দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে কেবল বয়সকে নিয়োগের মানদণ্ড করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক চিত্র: এক ভিন্ন বাস্তবতা
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে বয়সভিত্তিক বৈষম্য আইনত নিরুৎসাহিত করা হয়। জাপানের শ্রম পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তাদের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ১৩ শতাংশেরও বেশি এখন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, যারা দক্ষতার ভিত্তিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। এটি প্রমাণ করে যে, বয়স কোনোভাবেই কর্মক্ষমতার চূড়ান্ত সূচক নয়।
উত্তরণের পথ: আমাদের করণীয়
একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। কিছু প্রস্তাবনা হতে পারে:
১. দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন: নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে বয়সের চেয়ে প্রার্থীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
২. দ্বিতীয় সুযোগ (Second Chance Policy): জীবনের যেকোনো পর্যায়ে পুনরায় শিক্ষা বা কর্মজীবনে ফেরার সুযোগ রাখা।
৩. আজীবন শিক্ষা আইন: প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন।
৪. নমনীয় বয়সনীতি: বিশেষ করে জ্ঞানভিত্তিক ও প্রশাসনিক পেশায় কঠোর বয়সসীমা শিথিল করা।
উপসংহার:
বয়স কেবল একটি সংখ্যা। কোনো নাগরিক জীবনের যেকোনো পর্যায়েই যদি নিজের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ পান, তবে তা দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আমরা কি প্রস্তুত বয়সের বেড়াজাল ভেঙে মেধা ও দক্ষতাকে মূল্যায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে? সময় এসেছে এই প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে যুগোপযোগী নীতি গ্রহণের।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Heartfelt Thanks for your valuable comments.