— আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া (আরিফ শামছ্)
বিকেলের আলোটা সেদিন অদ্ভুত কোমল ছিল। কলেজ ক্যাম্পাসের পুরোনো অশ্বত্থগাছের ছায়া লম্বা হয়ে মাটির ওপর পড়েছিল। ক্লাস শেষে চারজন একসাথে বের হলো—দুই ভাইবোন, আর তাদের বন্ধু তিতাস ও নদী।
দিনটা ছিল কলেজ ভিজিটের। সারাদিন ঘোরাঘুরি, নানা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা, ক্যাম্পাসের ছবি তোলা—সব মিলিয়ে ক্লান্তি আর আনন্দ মিশে ছিল সবার মধ্যে।
গেটের কাছে এসে ছোট ভাইটি বলল,
— চল, কোথাও বসে একটু নাস্তা খাই।
প্রস্তাবটা সবাই একবাক্যে মেনে নিল। রাস্তার ওপাশে ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্ট ছিল। খুব বড় কিছু নয়—টিনের চাল, কাচের শোকেসে সিঙ্গারা-সমুচা, ভেতরে কয়েকটা কাঠের টেবিল।
চারজন বসে পড়ল।
অর্ডার এল—সমুচা, সিঙ্গারা, আর চা।
খাওয়ার চেয়ে গল্পই যেন বেশি হচ্ছিল। কলেজের নানা স্মৃতি, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, হালকা হাসি—সব মিলিয়ে মুহূর্তগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
তিতাস মাঝে মাঝে চুপচাপ নদীর দিকে তাকাচ্ছিল।
নদী খুব বেশি কথা বলছিল না, কিন্তু তার চোখে এক ধরনের নরম দীপ্তি ছিল। সেই দীপ্তি তিতাসের হৃদয়ে অদ্ভুত আলো ছড়াত।
সময় কেটে গেল।
খাওয়া শেষ হলে ওয়েটার বিলটা এনে টেবিলে রাখল।
তিতাস অভ্যাসবশত পকেটে হাত দিল।
আর সেই মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ একটা শূন্যতা তৈরি হলো।
তার পকেটে পর্যাপ্ত টাকা নেই।
এমন ঘটনা তার জীবনে প্রায় কখনো ঘটেনি। সাধারণত বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও গেলে বিল দেওয়ার চেষ্টা সে-ই করত। সেটা ছিল তার নীরব আনন্দ।
কিন্তু আজ ভাগ্য যেন অন্যরকম এক পরীক্ষা নিয়ে এসেছে।
মুহূর্তের মধ্যে তার মনে এক তীব্র অসহায়ত্ব জন্ম নিল।
সে কিছু বলার আগেই নদী বিলটা হাতে তুলে নিল।
নরম স্বরে বলল—
— থাক, আমি দিচ্ছি।
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে টাকা পরিশোধ করে দিল।
দুই ভাইবোন বিষয়টা নিয়ে তেমন কিছু ভাবল না। তারা আবার হাসতে হাসতেই রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে গেল।
কিন্তু তিতাসের ভেতরে যেন এক ঝড় শুরু হলো।
সে বুঝতে পারছিল—এই ছোট্ট ঘটনাটা তার হৃদয়ে গভীর দাগ রেখে যাচ্ছে।
কারণ বিষয়টা শুধু টাকা নয়।
তার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল দায়িত্ব। যত্ন নেওয়া। রক্ষা করা।
আর সেই দায়িত্বের এক সামান্য মুহূর্তেও সে যেন ব্যর্থ হলো।
সেদিনের বিকেলটা তাই তার মনে অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে রইল।
সময় এগিয়ে যেতে লাগল।
কলেজের দিন শেষ হলো। সবাই নিজের নিজের জীবনের পথে হাঁটতে শুরু করল।
তিতাস আর নদীর সম্পর্কও ধীরে ধীরে বাস্তবতার কঠিন প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়াল।
দুই পরিবারই আত্মমর্যাদাশীল। সামাজিক অবস্থান, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, নানা হিসাব—সব মিলিয়ে অদৃশ্য এক দেয়াল তৈরি হলো।
তারা কেউ কাউকে দোষ দেয়নি।
কেউ নাটকীয় কোনো ঘোষণা দেয়নি।
কিন্তু একদিন নীরবে বুঝে গেল—এই পথ একসাথে হাঁটা সম্ভব নয়।
প্রাণাধিক ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও।
সেই দিন থেকে তারা দুজনই নিজের নিজের জীবনে এগিয়ে গেল।
তবু কিছু স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।
বহু বছর পরও তিতাস মাঝে মাঝে সেই বিকেলটার কথা ভাবে।
ছোট্ট রেস্টুরেন্ট।
এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা।
কয়েকটা সমুচা।
আর একটি সামান্য বিল।
মানুষের জীবনে বড় ট্র্যাজেডি নয়, বরং এমন ক্ষুদ্র মুহূর্তই কখনো কখনো সবচেয়ে গভীর স্মৃতি হয়ে থাকে।
তিতাস মাঝে মাঝে ভাবতে বসে—
সেদিন যদি তার পকেটে কয়েকটা টাকা বেশি থাকত!
হয়তো কিছুই বদলাত না।
হয়তো তাদের ভাগ্য তবুও আলাদা হয়ে যেত।
তবু তার মনে হয়—সেই ছোট্ট অপারগতাই যেন তার হৃদয়ে এক অদৃশ্য দাগ এঁকে দিয়েছে।
নদী হয়তো কখনো তাকে ছোট মনে করেনি।
কিন্তু নিজের চোখে সে নিজেকে মাঝে মাঝে একদিনের জন্য কপর্দকহীন প্রেমিক বলেই মনে করে।
আর সেই স্মৃতির সাগরে আজও সে নীরবে সন্তরণ করে যায়—
অন্তহীন বিরহের জলে।
-------(সমাপ্ত)--------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Heartfelt Thanks for your valuable comments.