- স্কুল ও কলেজ: সরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৫৯ বছর এবং এমপিওভুক্তসহ সকল বেসরকারি শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬০ বছর।
- বিশ্ববিদ্যালয়: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছর।
- মাদ্রাসা: সরকারি মাদ্রাসার শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৫৯ বছর এবং বেসরকারি বা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬০ বছর।
- প্রাথমিক বিদ্যালয়: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৫৯ বছর।
শিক্ষক সংকট, বয়সসীমা ও নিবন্ধনধারীদের দীর্ঘ অপেক্ষা
— আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া (আরিফ শামছ্)
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্তমানে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য বিরাজ করছে। একদিকে হাজার হাজার শিক্ষক পদ শূন্য পড়ে আছে, অন্যদিকে বহু যোগ্য ও নিবন্ধনধারী প্রার্থী বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। রাষ্ট্রের এই দ্বৈত বাস্তবতা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার উদাহরণ নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও এক গভীর সংকেত।
সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) জানিয়েছে, নবম গণবিজ্ঞপ্তির জন্য প্রায় ৭৮ হাজার শূন্যপদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শূন্যপদ সহকারী শিক্ষকের। এত বিপুল শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও কেন পদগুলো পূরণ হচ্ছে না—এই প্রশ্ন এখন শিক্ষক সমাজ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝেও জোরালো হয়ে উঠেছে।
এনটিআরসিএর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সংখ্যক আবেদন পাওয়া যাচ্ছে না। বাস্তবে এর পেছনে আরও গভীর কারণ রয়েছে। দীর্ঘসূত্রিতা, জটিল নীতিমালা, মামলাজট, বয়সসীমা এবং সনদের মেয়াদসংক্রান্ত বিধিনিষেধ—সব মিলিয়ে বহু নিবন্ধনধারী কার্যত নিয়োগের সুযোগ হারিয়েছেন।
বিশেষ করে ১ম থেকে ১২তম শিক্ষক নিবন্ধনধারীদের বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক ও নীতিগত গুরুত্ব বহন করে। এদের অনেকেই একসময় রাষ্ট্রীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধীরগতি, প্রশাসনিক অবহেলা এবং দীর্ঘ আইনি জটিলতার কারণে আজ অনেকেই বয়সসীমা অতিক্রম করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে—এই দায় কি শুধুই প্রার্থীদের?
যখন একজন প্রার্থী রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তখন তিনি একটি যোগ্যতার স্বীকৃতি অর্জন করেন। অথচ বছরের পর বছর নিয়োগ না দিয়ে পরে বলা হয় বয়স ৩৫ পার হয়ে গেছে—এটি কি ন্যায়সংগত? যদি সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হতে পারে, তাহলে ৩৫ বছর পার হলেই একজন যোগ্য শিক্ষক কেন অযোগ্য হয়ে যাবেন?
বাংলাদেশে বর্তমানে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব প্রকট। বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে বহু অভিজ্ঞ নিবন্ধনধারীকে বাদ দিয়ে নতুন করে সংকট তৈরি করা রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর।
বয়সসীমা অন্তত ৫০ বছর পর্যন্ত শিথিল করা অথবা বিশেষ বিবেচনায় পুরাতন নিবন্ধনধারীদের জন্য আলাদা সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এতে একদিকে শিক্ষক সংকট কমবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের প্রতি ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত হবে।
একইভাবে নিবন্ধন সনদের মেয়াদ মাত্র ৩ বছর নির্ধারণ করাও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীর যোগ্যতা আজীবন বহাল থাকে, অথচ শিক্ষক নিবন্ধনের মতো একটি রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার সনদ কেন মেয়াদোত্তীর্ণ হবে—এ প্রশ্নও যৌক্তিক।
বর্তমানে দেশের বহু নিবন্ধনধারী বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, কেউ শিক্ষকতা করছেন, কেউ কোচিং পরিচালনা করছেন, কেউ আবার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। অর্থাৎ তারা এখন আগের চেয়ে আরও বেশি দক্ষ। রাষ্ট্র চাইলে এই অভিজ্ঞ জনশক্তিকে শিক্ষা খাতে কাজে লাগাতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়; এটি জাতি গঠনের দায়িত্ব। তাই শিক্ষক নিয়োগে শুধুমাত্র বয়স নয়, যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
আজ প্রয়োজন বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত। প্রয়োজন দ্রুত মামলাজট নিরসন, নীতিমালা সংস্কার এবং শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ। অন্যথায় একদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষকশূন্য থাকবে, অন্যদিকে যোগ্য নিবন্ধনধারীরা হতাশা ও বঞ্চনার ভার বয়ে বেড়াবেন।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, তবে পুরাতন নিবন্ধনধারীদের বিষয়টি মানবিক ও বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনা করার এখনই সময়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Heartfelt Thanks for your valuable comments.