বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২৬

রহস্যময় অশ্বারোহী (সত্য ঘটনা)

জায়নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁপছি। ঘাড়ের ওপর চকচকে ধারালো ছুরি ধরে দাঁড়িয়ে আছে জল্লাদ রূপী এক ডাকাত।

আতঙ্কের তীব্রতায় আমার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ অসাড়, কুরআনের একটা আয়াতও মনে পড়ছে না!

ওদিকে জল্লাদটা পেছন থেকে গর্জে উঠছে, "কী হলো? জলদি শেষ কর, তোকে জবাই করব!"

ঠিক সেই মুহূর্তে যখন চোখ বুজে মৃত্যুর প্রহর গুনছি, তখনই ঘটল মহাবিশ্বের এক অলৌকিক ঘটনা...

উপরে উল্লেখিত হাড়হিম করা সত্য ঘটনাটি ইমাম ইবনে কাছির (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘তাফসিরে ইবনে কাছির’-এ বর্ণনা করেছেন। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক:

আবু বকর মুহাম্মদ বিন দাউদ আদ-দ্বীনওয়ারী (যিনি ‘দাক্কী সূফী’ নামে পরিচিত) এক খচ্চর চালকের বরাতে ঘটনাটি এভাবে শুনিয়েছেন:

"আমি দামেস্ক থেকে জাবাদানী যাওয়ার পথে ভাড়ায় খচ্চর খাটাতাম। একবার এক ব্যক্তি আমার খচ্চরে চড়ে রওয়ানা হলো।

পথিমধ্যে সে আমাকে একটি অপরিচিত ও নির্জন পথ দেখিয়ে বলল, 'এই রাস্তা দিয়ে চলো, এটা অনেক সংক্ষিপ্ত পথ।'

আমি বললাম, 'এই রাস্তা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।'

সে জোর দিয়ে বলল, 'আরে না, এটিই সবচেয়ে কাছের রাস্তা, তুমি চলো।'

তার কথায় বিশ্বাস করে আমি সেই নির্জন পথটি ধরলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর আমরা অত্যন্ত দুর্গম একটা পাহাড়ি উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছালাম।

সেখানে গিয়ে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল; দেখলাম চারদিকে অসংখ্য মানুষের লাশ পড়ে আছে!

হঠাৎ সেই যাত্রীটি নিচে নেমেই তার জামার ভেতর থেকে একটি ধারালো ছুরি বের করে সরাসরি আমার দিকে তেড়ে এলো!

আমি প্রাণভয়ে দৌড় দিলাম, সেও আমার পিছু পিছু ছুটল।

আমি তাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বললাম, 'ভাই! তুমি খচ্চর এবং সমস্ত মালামাল নিয়ে নাও, আমাকে ছেড়ে দাও!'

সে বলল, 'ওগুলো তো আমার হয়েই গেছে। আমি মাল নয়, সরাসরি তোমাকেই হত্যা করতে চাই।'

যখন আমি নিশ্চিত বুঝলাম যে সে আমাকে মেরেই ফেলবে, তখন আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম,

'ঠিক আছে, তুমি যদি দয়া করে আমাকে মৃত্যুর আগে মাত্র দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ দিতে?'

সে বলল, 'আচ্ছা ঠিক আছে, যা করার জলদি করো।'

আমি কাঁপতে কাঁপতে নামাজের জন্য দাঁড়ালাম। কিন্তু আতঙ্কের তীব্রতায় আমার মস্তিষ্ক যেন সম্পূর্ণ অসাড় হয়ে গেল। আমি কুরআনের কোনো একটি সূরার একটি হরফও মনে করতে পারছিলাম না!

সম্পূর্ণ কুরআন যেন আমার স্মৃতি থেকে মুছে গেল। আমি জায়নামাজে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ওদিকে ডাকাতটি অধৈর্য হয়ে পেছন থেকে চিৎকার করে বলছিল, 'কী হলো? জলদি শেষ করো!'

ঠিক সেই চরম মুহূর্তে — যখন ছুরি আমার ঘাড়ের ওপর, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অলৌকিকভাবে আমার জিহ্বায় পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি জারি করে দিলেন:

 أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ 

অর্থ:"নাকি তিনি, যিনি আর্তের ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে ডাকে এবং কষ্ট ও বিপদ দূরীভূত করেন?" (সূরা আন-নামল: ৬২)

আয়াতটি পড়ার পর আমি দেখলাম, উপত্যকার প্রবেশমুখ দিয়ে এক তেজী ঘোড়ায় চড়ে একজন অশ্বারোহী বিদ্যুতবেগে ছুটে আসছেন। তাঁর হাতে ছিল একটি ধারালো বল্লম।

তিনি এসে কোনো কথা না বাড়িয়ে সরাসরি সেই ডাকাতকে লক্ষ্য করে বল্লম ছুড়ে মারলেন। বল্লমটি নিখুঁতভাবে এসে সরাসরি ডাকাতের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। ডাকাতটি এক মুহূর্তের মধ্যে নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

আমি দ্রুত সেই রহস্যময় অশ্বারোহীর কাছে ছুটে গেলাম এবং তাঁর ঘোড়ার লাগাম ধরে কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করলাম, 

'আল্লাহর দোহাই দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আপনি কে? এই জনমানবহীন প্রান্তরে আমার প্রাণ বাঁচালেন?'

তিনি জবাব দিলেন,
"আমি তাঁর প্রেরিত দূত (ফেরেশতা), যিনি আর্তের ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে ডাকে এবং সমস্ত কষ্ট ও বিপদ দূর করে দেন।"

ব্যক্তিটি বলেন, এরপর আমি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলাম। আমার খচ্চর এবং মালামাল নিরাপদে গুছিয়ে নিয়ে সহীহ-সালামতে নিজের শহরে ফিরে এলাম।"

দুনিয়ায় সব দরজা যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখনও আল্লাহর দরজা বন্ধ হয় না। মানুষের সাহায্য শেষ হলেও, আল্লাহর সাহায্য কখনোই শেষ হয় না। অসহায় হৃদয়ের দোয়া কখনোই বৃথা যায় না।

© Salman Farsi 
তথ্যসূত্র:
• তাফসিরে ইবনে কাছির (সূরা আন-নামল, আয়াত: ৬২-এর তাফসির অংশ)।
• তারিখে দিমাশক

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Heartfelt Thanks for your valuable comments.

ভালবাসি দিবা-নিশি _সূচীপত্র

রহস্যময় অশ্বারোহী (সত্য ঘটনা)

জায়নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁপছি। ঘাড়ের ওপর চকচকে ধারালো ছুরি ধরে দাঁড়িয়ে আছে জল্লাদ রূপী এক ডাকাত। আতঙ্কের তীব্রতায় আমার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ অসাড়, কু...

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

জনপ্রিয় পোষ্টগুলি:

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ